করোনায় আমরা চান্দিনাবাসী কতটা মানবিক? | Chandina Protidin

করোনায় আমরা চান্দিনাবাসী কতটা মানবিক?

গত ১১ জুন আমার খুব কাছের এক সহকর্মী চান্দিনা রিপোর্টার্স ইউনিটির সহ-সভাপতি ও দৈনিক ভোরের ডাক পত্রিকার চান্দিনা প্রতিনিধি গোলাম মোস্তফা ভাইয়ের মৃত্যু আমাকে ভাবিয়েছে অনেক কিছু। আর সে ভাবনার আলোকেই আমার আজকের এ লেখা। মহান রাব্বুল আলামিন মোস্তফা ভাইকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুক, আমিন। সেসাথে শোক সন্তোপ পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।

শুধু মৃত্যুভয়ে আমরা দিন দিন বড্ড অমানবিক হয়ে যাচ্ছি । প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে, মৃত্যু অনিবার্য জেনেও করোনায় আক্রান্ত হওয়া আমাদের প্রিয় মানুষের লাশের সাথে কি এক অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ করছি! আজ আপনার প্রিয় মানুষটি মারা গেছেন কাল হয়ত আপনিও। আজ আপনি যেমন আচরণ করছেন লাশের সাথে আগামীকালও আপনার লাশের সাথে ঠিক  একই আচরণ করবে পাশের পরিবার, পরিজন, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশিরা।
চান্দিনার কোথাও কোথাও লাশ দাফনে গ্রামবাসীর বাঁধা, স্বেচ্ছাসেবীদের সাথে বাজে আচরণ, লাশ গোসল করানোর জন্য একটা বালতি, গোসলের সময় মৃত ব্যক্তির দেহ ঢাকার কাপড়টুকুও না দেওয়া, গ্রাম বাসীর প্রবল ঘৃণা ও অবহেলা, লাশের কাছে প্রিয় মানুষের না যাওয়া, বদ্ধ রুমে লাশ ফেলে চলে যাওয়ার ঘটনা কিংবা রুমের ভিতর লাশ রেখে বাহির হতে তালা দেওয়া– বড্ড অমানবিক, নির্দয় ও নিষ্ঠুর আচরণের বহিঃপ্রকাশ। এমন পাষান মন মিয়ে মহান রাব্বুল আলামিনের দুনিয়ায় আপনি কতদিন টিকে থাকবেন, আর কতটা ভাল থাকবেন সেটা ভেবে দেখুন একবার। আর এই পাষবিক আচরণধারী আপনাদের কাছ থেকেও রাষ্ট্র, সমাজ, পাড়া মহল্লার লোকজন ভাল কি আশা করতে পারে সেটাও ভাবনার বিষয়!

আসলে করোনা আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর সংস্পর্শে গিয়ে কাফন-দাফন এর কার্যক্রম করলেই যে আপনি আক্রান্ত হবেন, তা কিন্তু নয়! তাহলে কুমিল্লা উত্তর জেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সদস্য লিটন সরকার বহু আগেই আক্রান্ত হতে পারতেন। সাথে তাদের সদস্যরাও। সচেতন হয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সকল নিয়ম-কানুন মেনে চলে আপনিও করোনা আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে যেতে পারেন। তাদের পাশে থাকতে পারেন, মানসিক সাপোর্ট দিতে পারেন। মৃত্যুর পর তাদের দাফন কার্যেও অংশগ্রহণ করতে পারেন।

বর্তমান পরিস্থিতির সম্মূখভাগের যোদ্ধা ‘ডাক্তার’ ও ‘নার্স’ রাও প্রতিনিয়ত করোনা আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে যাচ্ছেন। করোনায় আক্রান্ত জন্মদাতা বাবার পাশে থেকে দিন রাত সেবা দিয়ে গেছে তার সন্তান। হাতে গ্লোভস লাগিয়ে বাবার হাত ধরে সারা রাত বসে ছিলেন। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে বলতে পারেনি সন্তান। সকালবেলা জেগে উঠে দেখে বাবা এখনও ঘুমাচ্ছে। ঐ সন্তানও করোনায় আক্রান্ত হয়নি। তাহলে আমার আর আপনার কেন এত করোনা ভয়? কেন এত অমানবিক আচরণ? কেন এত মৃত্যুভয় আমাদের? আমাদের মানসিক ভাবনাগুলোর এত অধঃপতন কেন? প্রিয় মানুষটির মৃত্যুতে আমরা দূরে সরে যাচ্ছি কেন?

চান্দিনাবাসীর উদ্দেশ্যে আমার অনুরোধ, কুমিল্লা জেলায় করোনা পরিস্থিতি খুব ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে। দেবিদ্বার, মুরাদনগর, চান্দিনাসহ আরো বেশ কিছু উপজেলায় করোনার প্রাদুর্ভাব ব্যাপকহারে ছড়াচ্ছে। তাই বলে আমরা স্বার্থান্বেষী মনোভাব নিয়ে করোনা আক্রান্তের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে পারিনা। তাদের মানসিক সাপোর্ট থেকে শুরু করে যাবতীয় সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করুন। আশপাশে কারোর মৃত্যুতে এতটা অমানবিক না হয়ে নিয়ম বিধি মেনে চলে তাদের দাফন কার্যে সহযোগিতা করুন। তাহলে দেখবেন আগামী কাল আপনার মৃত্যুতেও অন্যরা এগিয়ে এসে আপনার লাশ কবরে শুয়াবে কিংবা শশ্মানঘাটে নিয়ে যাবে। প্লিজ… প্লিজ…. এমন অমানবিক, নির্মম আর পাষবিক আচরণে নিজের মনকে কলুষিত করা থেকে বিরত রাখুন।দেখবেন মানসিক শান্তি থেকে শুরু করে ইহকাল এবং পরকালের সব ধরনের কঠিন বিপদ-আপদ থেকে মহান রাব্বুল আলামিন আপনাকে হেফাজত করবেন।
চলমান দুর্যোগময় এই সময়ে করোনা আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির দাফন কার্যে সক্রিয় অংশগ্রহণে পাড়া বা মহল্লার মসজিদের ইমামগণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। মসজিদ কমিটিতে যারা দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের অনুরোধ জানাব, আপনারা পাড়াভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী টিম তৈরি করেন। যে টিমের প্রধান থাকবেন মসজিদের ইমাম সাহেব। খতিবসহ পাড়ার সাহসী যুবকদের এ টিমের মেম্বার করে তাদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিন। টিমের সুরক্ষাসামগ্রী ও দাফন কার্যে অন্যান্য খরচ জোগাতে পাড়ার বিত্তশালী কিংবা এলাকার জনপ্রতিনিধির কাছে সহযোগিতা চাইতে পারেন। আশা করছি আপনাদের এমন মানবিক কাজে সবাই সহযোগিতা করবে।

মনে রাখুন, আমরা এক ভয়াবহ মহামারি মোকাবিলা করছি। এই সময়ে সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে আমাদের মানসিক শক্তি। মনোবল চাঙা করে, অমানবিক ও নিষ্ঠুরতা দূরে ঠেলে, ‘মানুষ মানুষের জন্য’ এই মূলমন্ত্রে সবার পাশে থাকুন, সহযোগিতা করুন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে, যাবতীয় নিয়ম কানুন মেনে চলে আক্রান্ত ও সুস্থ ব্যক্তি উভয়ের পাশে থাকুন। আপনাদের একটুখানি অবহেলা ও ঘৃণায় হালকা অসুস্থ মানুষটিও মৃত্যুপথের পথিক হতে পারে!

আজ পাশের জন মারা যাচ্ছে, আগামীকাল আপনার মৃত্যুর কথা ভেবে মানবিক হউন। সাপোর্টিভ হউন, প্লিজ। আজ যদি আপনি করোনায় আক্রান্ত আপনার বাবার লাশ কাঁধে নিয়ে কবরস্থানে যান তাহলে আগামীকাল আপনার লাশ কবরে নিয়ে যাওয়ার শপথ করবে আপনার আদুরে সন্তানেরা। আপনাদের দেখানো পথ অনুসরণ করবে আপনার সন্তানেরা। এমন কিছু শিখাবেন না যেন আগামীকাল আপনি আক্রান্ত হলে আপনাকে ছেড়ে চলে যায় আপনার পরিজনেরা। করোনা মোকাবেলায় আপনাদের স্ত্রী, সন্তানসহ আশপাশের সবাইকে সুশিক্ষা ও মানবিক হওয়ার পরামর্শ দিন।

আর একেবারে শেষের দিকে একটা কথাই বলে যেতে চাই, মহান রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছায় একদিন এই পৃথিবী আবারো শান্ত হবে, সবাই প্রিয়জনদের নিয়ে ঘুরতে বের হবে। সন্তানদের হাত ধরে স্কুলে দিয়ে আসবে অভিভাবকেরা। সবকিছু…. সবকিছুই একদিন স্বাভাবিক হবে, ইনশাআল্লাহ। তবে সেদিন আজকের ‘লিটন সরকার’ ও তার টিমের একান্ত অনুগত ও নিবেদিত সদস্যরাই মানবতার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরন হয়ে থাকবেন। সমাজে ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ হিসেবে তারাই বেশি পরিচিতি পাবেন। আজকে লিটন সরকার যে মানবিক কাজগুলো করে যাচ্ছেন, তা সত্যিই মানবতার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ। মহান রাব্বুল আলামিন তাদেরকে তিনার হেফাজতে রাখুক। আমিন….

লেখক-সাদেক হোসেন
চান্দিনা প্রতিনিধি, দৈনিক আজকালের খবর
নির্বাহী সম্পাদক, চান্দিনা প্রতিদিন ডট কম।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Ajker-Comilla

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
চান্দিনা প্রতিদিন ২০১৬-২০১৯

প্রধান সম্পাদক: সাইফুদ্দিন বাপ্পী, নির্বাহী সম্পাদক: সাদেক হোসেন, মোবাইল-০১৬৮১-৯৩৯৭৩৫
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়- চান্দিনা হাইস্কুল মার্কেট (২য় তলা), চান্দিনা থানা রোড, কুমিল্লা।
Email- news.chandinapratidin@gmail.com